বিজেপি ধর্মীয় তাস খেলা! রাজ্যে মাইকে আজান বন্ধে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা অর্জুনের

সাইফুদ্দিন মল্লিক : পশ্চিমবঙ্গে মাইকে আজান বন্ধের মামলা বিজেপির। আজানের সময়ে ব্যবহার করা যাবে না লাউডস্পিকার বা অ্যামপ্লিফায়ার। শব্দের জন্য ব্যবহৃত ওই সকল বৈদ্যুতিন সামগ্রী মসজিদ থেকে বর্জনের দাবিতে দায়ের করা হল মামলা হাইকোর্টে।

মঙ্গলবার কলকাতা হাইকোর্টে এই মর্মে পিটিশন দাখিল করেছেন ব্যারাকপুরের সাংসদ অর্জুন সিং। আজ ৭ জুলাই তিনি তা সকলের উদ্দেশ্যে জানিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। রাতের দিকে নিজের ফেসবুক পেজে অর্জুন লিখেছেন, “আজানের সময় লাউডস্পিকার আর অ্যামপ্লিফায়ারের ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়ে আমি আজ মহামান্য কলকাতা হাই কোর্টে একটি পিটিশন জমা দিলাম।”

ফেসবুক পোস্ট লিঙ্ক : https://www.facebook.com/260047468214293/posts/559460408272996/

আজানের জন্য লাউডস্পিকারের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে উত্তরপ্রদেশের জৌনপুর জেলার বাদ্দোপুর গ্রামে অবস্থিত দুটি মসজিদে আজানের সময়ে মাইক ব্যবহারে নিষিদ্ধ করেছিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। বিচারপতি পঙ্কজ মিথাল এবং ভিপিন চন্দ্র দীক্ষিতের ডিভিশান বেঞ্চ বলেছে, “কোনও ধর্মই এটা শেখায় না যে প্রার্থনা করার সময়ে মাইক ব্যবহার করতে হবে বা বাজনা বাজাতে হবে। আর যদি সেরকম কোনও ধর্মীয় আচার থেকেই থাকে, তাহলে নিশ্চিত করতে হবে যাতে অন্যদের তাতে বিরক্তির উদ্রেক না হয়। মসজিদে আজানের সময়ে মাইক ব্যবহারের অনুমতি স্থানীয় প্রসাশন বন্ধ করে দিয়েছিল, তারই অনুমতিতে চেয়ে মামলা করা হয়েছিল।

অন্যদিক করোনার অজুহাতে দেখিয়ে উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকার রাজ্যে আজান নিষিদ্ধ করার আর্জি করেছিলেন কোর্টে। কিন্তু সেটি হয়নি। আজান সংক্রান্ত দুটি জনস্বার্থ মামলার রায়ে (১৫ মে) এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি শশীকান্ত গুপ্তা ও অজিত কুমারের সমন্বিত বেঞ্চ করোনা ভাইরাসের কারণে চলমান লকডাউনের মধ্যে মসজিদে লাউডস্পিকারে আজানে নিষেধাজ্ঞা দেন। আজানের সময় লাউডস্পিকার বাজানো যাবে কিনা, এই নিয়ে দুটি পৃথক মামলা হয়েছিল। একটি মামলা করেন বিএসপি সাংসদ আফজল আনসারি, অন্য মামলাটি করেন ফারুকাবাদের জনৈক ব্যক্তি সাইদ মুহাম্মদ ফয়সল। এই দুটি মামলার রায় এ দিন একসঙ্গে দেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। রমজান মাসে আজান গুরুত্বপূর্ন মুসলিমদের, এই মাসে মাইকে আজান দেয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। এই আর্জি নিয়েই মামলা হয়েছিল। একটি মামলা ছিল গাজিপুর জেলাতে আজানের অনুমতি নিয়ে। এই জেলাতে আলাদা করে আগেই মাইকে আজান নিষিদ্ধ ছিল।

এলাহাবাদ কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ বলেন, আজান দেওয়ার সময় মাইক বা লাউডস্পিকার বাজানো চলবে না, মোয়াজ্জেমকে খালি গলায় দিতে হবে আজানের ডাক। লাউডস্পিকার বাজালে তা জনসমাগম বাড়াবে, ছড়াবে করোনাভাইরাস তাই রাজ্যের করা আইন মোতাবেক এই সিদ্ধান্ত। যদিও রাজ্য প্রশাসন চেয়েছিল, খালি গলাতেও আজান নিষিদ্ধ করতে, কিন্তু হাইকোর্ট তা খারিজ করে দেয়। কেন খালি গলায় আজান দিলে তা আইন ভাঙা হবে, তার সপক্ষে কোনও যুক্তি দিতে পারেনি উত্তরপ্রদেশ সরকার। বিচারপতি শশীকান্ত গুপ্ত ও বিচারপতি অজিত কুমারের বেঞ্চ বলেন, লাউডস্পিকারে আজান শান্তিপূর্ণ ঘুমের ক্ষতি করে। এক জনের অধিকারের জন্য অপরের অধিকারকে বিঘ্নিত করা ঠিক নয়। বিচারপতিরা আরো বলেছেন, ‘আজানকে আমরা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে মান্য করি। কিন্তু লাউড স্পিকারে আজান দেওয়া ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নয়। ফলে তা মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে না। বরং তা সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও শারীরিক প্রভাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’ সঙ্গে আদালত বলে, ‘কেউ যদি কিছু শুনতে না চায় তাকে তা জোর করে শোনানো মৌলিক অধিকার হরণের সমতুল।’ আজান দেওয়া নিয়ে কথা। তা খালি গলাতেও দেওয়া যেতে পারে এবং তাই-ই দিতে হবে। কোনও মাইকের ব্যবহার করা চলবে না।

উত্তরপ্রদেশের পথ ধরে বাংলাতেও মাইকে আজান নিষিদ্ধ করতে আইনের পথে হাঁটলেন বিজেপি। আজান নিয়ে অর্জুন সিং-এর মামলা সম্পূর্ন রাজনৈতক হাতিয়ার। সামনে ২১-এ বিধানসভা ভোট সেই দিকে লক্ষ্য রেখে ধর্মীয় উস্কানি তৈরি করতে আজান মামলা। হিন্দু ভোটকে সম্পূর্ন নিজেদের দিকে টানতে কূটকৌশল বিজেপির। রাজ্য সরকাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে ভোটের ময়দানে মেনে পড়লেন বিজেপি বলাই যায়! মাইকে আজান বন্ধের মামলাতে রাজ্য সরকার, রাজ্যের অনান্য রাজনৈতিক পাটি এবং বাংলার বুদ্ধিজীবী মহলের প্রতিক্রিয়া কি করেন সেটি দেখার বিষয়!