অঙ্গ দানে মরেও প্রাণ বাঁচালেন তিন জনের, এক-জনকে চোখের আলো, ইতিহাস সৃষ্টি ডাঃ সংযুক্তার

নিউজ ডেস্ক : মৃত্যুর পরেও মানুষকে জীবন দান করে গেলেন ডাক্তার। তাঁর হাতযশে বহু অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। পুনর্জীবন পেয়েছেন বহু মানুষ। ব্রেন অপারেশনের ক্ষেত্রেও সার্জেনদের ‘অটোমেটিক চয়েস’ হয়ে উঠেছিলেন অ্যানেস্থেশিষ্ট ডা. সংযুক্তা শ্যাম রায়। মৃত্যুর পরও তিনি পুনর্জীবন দিলেন তিনজনকে। ‘ব্রেন ডেথ’ হওয়া সংযুক্তার কিডনি, লিভার প্রতিস্থাপিত হল তিনজনের শরীরে। প্রতিস্থাপনের পর তাঁরা প্রত্যেকেই সুস্থ আছেন। বুধবার সকালে একে একে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে প্রতিনিধিদল আসেন অ্যাপোলোতে। প্রথমে লিভার সংগ্রহ করা হয়, তারপর ধাপে ধাপে দু’টি কিডনি ও কর্নিয়া। এ এক ইতিহাস রচিত হলো। রাজ্যের চিকিৎসা জগতে এক অনন্য নজির হয়ে রইল। পরিবারকে কুর্নিশ জানিয়েছে চিকিৎসা মহল।

৩-মে মঙ্গলবার অ্যাপোলোয় ব্রেন ডেথের পর তাঁর মরণোত্তর লিভার ও দু’টি কিডনি নিয়ে নতুন জীবন পেল কলকাতা ও লাগোয়া শহরতলির তিন বাসিন্দার। রিজিওনাল অর্গ্যান অ্যান্ড টিস্যু ট্রান্সপ্লান্ট অর্গানাইজেশন (রোটো) সূত্রে জানা গিয়েছে, গভীর রাতে তাঁর মরণোত্তর অঙ্গ আহরণ (রিট্রিভ্যাল) ও সংরক্ষণের (হার্ভেস্টিং) প্রক্রিয়া শুরু হয়। আজ, বুধবার গ্রহীতাদের শরীরে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অপারেশন করা হয়। পাশাপাশি আরও একজন চিকিৎসকের কর্ণিয়া পাবেন।

এনআরএস মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তনী সংযুক্তা শ্যাম রায় অ্যাপোলো হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। হাসপাতাল সূত্রে খবর, গত শনিবার তাঁর মারাত্মক কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। বেশ কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় হৃদযন্ত্র। পরে তা সচল হলেও রক্ত সরবরাহের অভাবে ক্ষতি হয়ে যায় মস্তিষ্কের। সোমবার সকালে চিকিৎসকরা বুঝে যান, রোগিনীর ব্রেন ডেথ হতে চলেছে। এরপরই মৃতার চিকিৎসক স্বামী অঙ্গদানের ব্যাপারে সম্মতি দিয়ে দেন। কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণে সংযুক্তার হার্ট প্রতিস্থাপনের জন্য নেওয়া না-হলেও লিভার ও দু’টি কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য গ্রহীতার খোঁজ শুরু হয়। ঠিক হয়, অ্যাপোলোরই এক রোগীর শরীরে লিভার প্রতিস্থাপিত হবে। একটি কিডনি পাবেন এসএসকেএমের এক রোগী এবং অন্য কিডনিটি পাবেন দমদম আইএলএস হাসপাতালের এক রোগী।
কিডনি প্রতিস্থাপনের কাজের সঙ্গে ডা. প্রতিম সেনগুপ্ত যুক্ত থাকবেন বলে সূত্রের খবর। প্রাথমিকভাবে এসএসকেএমে তিনজন ও আইএলএসের চারজন কিডনি বৈকল্যের রোগীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে দু’জন পাবেন দু’টি কিডনি। এখানেই শেষ নয়, চিকিৎসকের কর্নিয়া থেকে দৃষ্টি পাবেন এক জন্মান্ধ। তাই বেসরকারি চক্ষু হাসপাতাল দিশা কর্নিয়া সংগ্রহ করেছে। বিশিষ্ট চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সমর বসাকের কথায়, “মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মৃত্যু। অত্যন্ত দুঃখের। কিন্তু আমার মনে পড়ছে না কোনও চিকিৎসক মৃত্যুর পরেও এমন নজির করতে পারেন। তাঁর পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে বলি যে এমন নজির যেন আমরাও গড়তে পারি।”

বুধবার সকালে চেন্নাই থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একটি দল আসে। তারা সংযুক্তার লিভার প্রতিস্থাপন করেন ৬১ বছরের এক বয়স্ক ব্যক্তির দেহে। সূত্রের খবর, ওই রোগী কলকাতার বাসিন্দা। লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিলেন। প্রতিস্থাপনের পর ওই ব্যাক্তি চিকিৎসদের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে আছেন। প্রতিস্থাপন সফল হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

৪৩ বছরের সংযুক্তার একটি কিডনি চলে যায় এসএসকেএম হাসপাতালে। অপরটি দমদমের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। দমদমের ওই বেসরকারি হাসপাতালে ৫১ বছরের এক মহিলার দেহে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। কিডনি প্রতিস্থাপনের পর রোগী ভাল আছেন। প্রতিস্থাপনকারী নেফ্রোলজিস্ট ডা প্রতিম সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘সংযুক্তার স্বামী ও তাঁর আত্মীয়রা যে নজির তৈরি করলেন তাকে কুর্নিশ করি। বেঁচে থেকে যেমন অগণিত রোগীর জীবন বাচিয়েছেন। মৃত্যুর পরে আরও তিনজনের জীবনদান করলেন। চিকিৎসক এইভাবেই আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন”। এদিকে এসএসকেএম হাসপাতালে বছর তেত্রিশের এক যুবকের দেহে দ্বিতীয় কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সেই যুবকও ভালো আছে বলে এসএসকেএম সূত্রে খবর।